ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঞ্চিত কৃষক সমাজ কী পাবেন
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঞ্চিত কৃষক সমাজ কী পাবেন
আন্দোলন প্রতিবেদন
শনিবার, ২৪ জানুয়ারী ২০২৬ | অনলাইন সংস্করণ
কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের উন্নয়ন কৃষি ও কৃষকের সার্বিক অগ্রগতির সাথে সম্পর্কিত। এদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ এখনও কৃষি অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত। এর মধ্যে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষির সাথে সরাসরি যুক্ত। জুলাই’২৪ অভ্যুত্থানে পতন ঘটে প্রবল পরাক্রমশালী ভারতের বিশ্বস্ত ফ্যাসিস্ট হাসিনার। অনেকের ভাষায় এটা বিপ্লব, দ্বিতীয় স্বাধীনতা হলেও অভ্যুত্থানের এ সরকারের দেড় বছরেও কৃষকের হাল দূরাবস্থার মধ্যেই। সংস্কারের ধুয়ো তোলা ইউনূস সরকার ১১টি কমিশন গঠন করলেও সেখানে স্থান হয়নি কৃষি কমিশনের। এটা কৃষি এবং কৃষকের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের তাচ্ছিল্যতাকেই প্রমাণ করে। বিগত সরকারগুলোর মতো এ সরকার কৃষকের উৎপাদনশীলতা নিয়ে সরব থাকলেও উৎপাদক কৃষকের বেহাল দশা নিয়ে নীরব। জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৩-১৫ শতাংশ হলেও প্রধানত তা নিজস্ব সক্ষমতার প্রকাশ। গার্মেন্টস বা প্রবাসী আয়ের মতো বাবল অর্থনীতির বিপরীতে কৃষিখাত দাঁড়িয়ে আছে দেশীয় নিজস্ব ভিত্তির উপর। বিগত দিনগুলোর রাষ্ট্র-সরকার কৃষির নিজস্বতা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষি হয়ে উঠেছে করপোরেট বা বহুজাতিক কোম্পানির উপর নির্ভরশীল। তেল-সার-কীটনাশক-বীজ থেকে হালের যান্ত্রিকীকরণের নামে পাওয়ার টিলার, হারভেস্টিং মেশিন সবই সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী কোম্পানির উপর নির্ভরশীল। বিগত দেড় বছরে সরকারের এমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি যা পূর্বের সরকারের তুলনায় ব্যতিক্রম।
তাদের ঘোষিত বাজেটে কৃষিতে ব্যয় ধরা হয়েছে পূর্বের মতোই। বাগাড়ম্বর করা হচ্ছে কৃষিতে ভতুর্কি বাড়ানো হয়েছে বলে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে দরিদ্র মানুষের মধ্যে অল্প মূল্যে চাল-আটা বিতরণের কার্যক্রমে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। এ মুহূর্তে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ২৫ শতাংশ কমলেও তা দেশীয় বাজারের সাথে সমন্বয় করা হয়নি। নাম মাত্র কমিয়ে বিক্রি হচ্ছে প্রায় আগের চড়া মূল্যে।
কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে সার সংকট। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তা প্রতি ৪০০/৫০০ টাকা বেশি। সিণ্ডিকেটের উপর দায় দিয়ে নিজেরা পার পেতে চাইছে। নেই সমাধানের কোনো উদ্যোগ। চড়া মূল্যস্ফীতি যা প্রায় ৮ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার উপরে থাকায় কৃষিতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। বিপরীতে ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষক হতাশ। চাষীরা কালেভদ্রে কোনো ফসলের দাম পেলে, পরের বছর ব্যাপকভাবে সে ফসলের আবাদ দেখা যায়। অতি উৎপাদনে উৎপাদন খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। যা রাষ্ট্র-সরকারের পরিকল্পিত কৃষি নীতির অভাব।
অভ্যুত্থ্যানের এ সরকারের আমলেও বিকল্প কিছু হয়নি। যা কৃষককে আশ্বস্ত করতে পারে। বিশ্ব বাজারে চালের দাম কমে গেলেও দেশীয় বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বিক্রি হচ্ছে আগের চড়া মূল্যে। তাই বলে চাষীরা বেশি অর্থ পাচ্ছে তা নয়। মিল মালিকরা লাভবান হচ্ছে। বিপরীতে বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে যে দরে তা উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উৎপাদক-ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মধ্যস্বত্বভোগী বা ব্যবসায়ীদের পোয়া বারো। এবার সবচেয়ে বড় ধরা খেয়েছেন আলু চাষীরা। সরকারের ২২ টাকা দরে ৫০ হাজার টন আলু কেনার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। কোল্ড স্টোরেজ থেকে পাইকারী দরে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১১-১৪ টাকা দরে। উৎপাদন, হিমাগার, পরিবহণ– ইত্যাদি বাবদ যেখানে খরচ কেজি প্রতি ৩৫ টাকা। এনজিও, চড়া মহাজনি সুদ নিয়ে জেরবার কৃষক। কৃষির এ জীর্ণ দশা নতুন প্রজন্মকে কৃষি প্রশ্নে অনুৎসাহিত করে তুলছে। নগরমুখীতা-বিদেশগামিতা বাড়ছে। কৃষির জন্য যা অশনি সংকেত। তাছাড়া অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, মৎস্য খামার– ইত্যাদি প্রকল্প কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে কৃষির বিশাল ক্ষতি করছে। সম্প্রতি মৎস্য খামার খননে বাধা দিতে গিয়ে এক কৃষকের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। কৃষির সাথে যুক্ত ৫৬ শতাংশ কৃষক এখনও ভূমিহীন। যাদের কিছু জমি রয়েছে তাদেরও একটা অংশ মাঝে মাঝেই দখল করে নিচ্ছে উন্নয়নের নামে সাম্রাজ্যবাদী-আমলামুৎসুদ্দি-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।
এছাড়া ঋণ ও সুদের ফাঁদে পড়ে বহু কৃষক সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। ইজারাদাররা জলাশয়গুলো দখল করে কৃষক ও জেলেদেরকে নির্মমভাবে শোষণ করছে। খোদ কৃষকের হাতে জমি, জলার মালিক জেলে– এই নীতির ভিত্তিতে ভূমি সংস্কার ও কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচি ছাড়া কৃষিকে সত্যিকারভাবে এগিয়ে নেয়া অসম্ভব। যার সাথে সম্পর্কিত শিল্পের বিকাশ। সত্যিকার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক সরকারই পারে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে। জুলাই সনদ, ত্রয়োদশ নিবার্চনে সাম্রাজ্যবাদের দালাল শাসকদের মুখ বদল হবে শুধু। তাদের থেকে কৃষকরা যে বঞ্চিত হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই কৃষকদের কৃষি বিপ্লবকে কেন্দ্রে রেখে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিপ্লবী সংগঠন-সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বঞ্চিত কৃষক সমাজ কী পাবেন
কৃষি নির্ভর বাংলাদেশের উন্নয়ন কৃষি ও কৃষকের সার্বিক অগ্রগতির সাথে সম্পর্কিত। এদেশের মোট জনগোষ্ঠীর ৮০ শতাংশ এখনও কৃষি অর্থনীতির সাথে সম্পর্কিত। এর মধ্যে মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৬০ শতাংশ কৃষির সাথে সরাসরি যুক্ত। জুলাই’২৪ অভ্যুত্থানে পতন ঘটে প্রবল পরাক্রমশালী ভারতের বিশ্বস্ত ফ্যাসিস্ট হাসিনার। অনেকের ভাষায় এটা বিপ্লব, দ্বিতীয় স্বাধীনতা হলেও অভ্যুত্থানের এ সরকারের দেড় বছরেও কৃষকের হাল দূরাবস্থার মধ্যেই। সংস্কারের ধুয়ো তোলা ইউনূস সরকার ১১টি কমিশন গঠন করলেও সেখানে স্থান হয়নি কৃষি কমিশনের। এটা কৃষি এবং কৃষকের প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের তাচ্ছিল্যতাকেই প্রমাণ করে। বিগত সরকারগুলোর মতো এ সরকার কৃষকের উৎপাদনশীলতা নিয়ে সরব থাকলেও উৎপাদক কৃষকের বেহাল দশা নিয়ে নীরব। জিডিপিতে কৃষির অবদান ১৩-১৫ শতাংশ হলেও প্রধানত তা নিজস্ব সক্ষমতার প্রকাশ। গার্মেন্টস বা প্রবাসী আয়ের মতো বাবল অর্থনীতির বিপরীতে কৃষিখাত দাঁড়িয়ে আছে দেশীয় নিজস্ব ভিত্তির উপর। বিগত দিনগুলোর রাষ্ট্র-সরকার কৃষির নিজস্বতা ক্রমান্বয়ে ধ্বংস করার উদ্যোগ নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় কৃষি হয়ে উঠেছে করপোরেট বা বহুজাতিক কোম্পানির উপর নির্ভরশীল। তেল-সার-কীটনাশক-বীজ থেকে হালের যান্ত্রিকীকরণের নামে পাওয়ার টিলার, হারভেস্টিং মেশিন সবই সাম্রাজ্যবাদী-সম্প্রসারণবাদী কোম্পানির উপর নির্ভরশীল। বিগত দেড় বছরে সরকারের এমন কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি যা পূর্বের সরকারের তুলনায় ব্যতিক্রম।
তাদের ঘোষিত বাজেটে কৃষিতে ব্যয় ধরা হয়েছে পূর্বের মতোই। বাগাড়ম্বর করা হচ্ছে কৃষিতে ভতুর্কি বাড়ানো হয়েছে বলে। প্রকৃত সত্য হচ্ছে দরিদ্র মানুষের মধ্যে অল্প মূল্যে চাল-আটা বিতরণের কার্যক্রমে এ অর্থ ব্যয় করা হবে। এ মুহূর্তে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম ২৫ শতাংশ কমলেও তা দেশীয় বাজারের সাথে সমন্বয় করা হয়নি। নাম মাত্র কমিয়ে বিক্রি হচ্ছে প্রায় আগের চড়া মূল্যে।
কৃত্রিমভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে সার সংকট। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বস্তা প্রতি ৪০০/৫০০ টাকা বেশি। সিণ্ডিকেটের উপর দায় দিয়ে নিজেরা পার পেতে চাইছে। নেই সমাধানের কোনো উদ্যোগ। চড়া মূল্যস্ফীতি যা প্রায় ৮ শতাংশ, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান সবার উপরে থাকায় কৃষিতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। বিপরীতে ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়ায় কৃষক হতাশ। চাষীরা কালেভদ্রে কোনো ফসলের দাম পেলে, পরের বছর ব্যাপকভাবে সে ফসলের আবাদ দেখা যায়। অতি উৎপাদনে উৎপাদন খরচ তোলা কঠিন হয়ে পড়ে। যা রাষ্ট্র-সরকারের পরিকল্পিত কৃষি নীতির অভাব।
অভ্যুত্থ্যানের এ সরকারের আমলেও বিকল্প কিছু হয়নি। যা কৃষককে আশ্বস্ত করতে পারে। বিশ্ব বাজারে চালের দাম কমে গেলেও দেশীয় বাজারে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বিক্রি হচ্ছে আগের চড়া মূল্যে। তাই বলে চাষীরা বেশি অর্থ পাচ্ছে তা নয়। মিল মালিকরা লাভবান হচ্ছে। বিপরীতে বাজারে ধান বিক্রি হচ্ছে যে দরে তা উৎপাদন খরচের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। উৎপাদক-ভোক্তা উভয়েই ক্ষতিগ্রস্ত হলেও মধ্যস্বত্বভোগী বা ব্যবসায়ীদের পোয়া বারো। এবার সবচেয়ে বড় ধরা খেয়েছেন আলু চাষীরা। সরকারের ২২ টাকা দরে ৫০ হাজার টন আলু কেনার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন হয়নি। কোল্ড স্টোরেজ থেকে পাইকারী দরে নতুন আলু বিক্রি হচ্ছে মাত্র ১১-১৪ টাকা দরে। উৎপাদন, হিমাগার, পরিবহণ– ইত্যাদি বাবদ যেখানে খরচ কেজি প্রতি ৩৫ টাকা। এনজিও, চড়া মহাজনি সুদ নিয়ে জেরবার কৃষক। কৃষির এ জীর্ণ দশা নতুন প্রজন্মকে কৃষি প্রশ্নে অনুৎসাহিত করে তুলছে। নগরমুখীতা-বিদেশগামিতা বাড়ছে। কৃষির জন্য যা অশনি সংকেত। তাছাড়া অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, মৎস্য খামার– ইত্যাদি প্রকল্প কৃষি জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি করে কৃষির বিশাল ক্ষতি করছে। সম্প্রতি মৎস্য খামার খননে বাধা দিতে গিয়ে এক কৃষকের মৃত্যু পর্যন্ত ঘটেছে। কৃষির সাথে যুক্ত ৫৬ শতাংশ কৃষক এখনও ভূমিহীন। যাদের কিছু জমি রয়েছে তাদেরও একটা অংশ মাঝে মাঝেই দখল করে নিচ্ছে উন্নয়নের নামে সাম্রাজ্যবাদী-আমলামুৎসুদ্দি-রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো।
এছাড়া ঋণ ও সুদের ফাঁদে পড়ে বহু কৃষক সর্বস্বান্ত হচ্ছেন। ইজারাদাররা জলাশয়গুলো দখল করে কৃষক ও জেলেদেরকে নির্মমভাবে শোষণ করছে। খোদ কৃষকের হাতে জমি, জলার মালিক জেলে– এই নীতির ভিত্তিতে ভূমি সংস্কার ও কৃষি বিপ্লবের কর্মসূচি ছাড়া কৃষিকে সত্যিকারভাবে এগিয়ে নেয়া অসম্ভব। যার সাথে সম্পর্কিত শিল্পের বিকাশ। সত্যিকার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দেশপ্রেমিক সরকারই পারে কৃষকের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে। জুলাই সনদ, ত্রয়োদশ নিবার্চনে সাম্রাজ্যবাদের দালাল শাসকদের মুখ বদল হবে শুধু। তাদের থেকে কৃষকরা যে বঞ্চিত হবে তা বলাই বাহুল্য। তাই কৃষকদের কৃষি বিপ্লবকে কেন্দ্রে রেখে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের বিপ্লবী সংগঠন-সংগ্রামকে এগিয়ে নিতে হবে।
আরও খবর
- শনি
- রোব
- সোম
- মঙ্গল
- বুধ
- বৃহ
- শুক্র